,

ফুটপাতে হকার বসা নিয়ে ত্রিমুখী সংঘর্ষে না’গঞ্জ রণক্ষেত্র

ঢাকা ব্যুরো: ফুটপাতে হকার বসা নিয়ে ত্রিমুখী সংঘর্ষে মঙ্গলবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে চাষাঢ়া এলাকা। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, পুলিশের শটগানের গুলি, কাঁদানে গ্যাস এবং লাঠিচার্জে কমপক্ষে অর্ধশত আহত হয়েছে। বিকালে নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী তার সমর্থকদের নিয়ে ফুটপাতে হকার উচ্ছেদকালে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। বিকাল সোয়া ৪টা থেকে নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কের ২নং রেলগেট এলাকা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষের সময় আইভী সমর্থকরা ফুটপাতে থাকা হকারদের চৌকিতে অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ এ সময় শতাধিক রাউন্ড শটগানের গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে।সংঘর্ষে মেয়র আইভী, সাংবাদিক, হকারসহ কমপক্ষে অর্ধশত আহত হয়েছেন। মেয়র আইভী অভিযোগ করেছেন, তাকে হত্যা করতে শামীম ওসমানের নির্দেশে তার লোকজন এ হামলা করেছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রত্যাহার দাবি করে বলেছেন, প্রশাসনের পূর্ণ সহায়তায় এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। অপরদিকে শামীম ওসমান এমপি বলেছেন, প্রশাসন যদি আমার পক্ষে হতো তাহলে প্রশাসন হকারদের ওপর গুলি ছুড়ত না। আমি দৌড়ে গেছি একটাই কারণে, আমার পার্টির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আমাকে ফোন করে বলেছেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। আমি না গেলে গণ্ডগোল আরও বড় হতো।
নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতে হকার বসানো নিয়ে কয়েকদিন ধরেই এমপি শামীম ওসমান ও আইভী সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। সর্বশেষ সোমবার বিকালে সমাবেশ করে শামীম ওসমান ঘোষণা দেন, মঙ্গলবার থেকে হকারদের পুনর্বাসনের আগে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিকাল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুটপাতে হকার বসবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে মেয়র আইভী নগরভবন থেকে বের হয়ে কড়া পুলিশি বেষ্টনীর মধ্যে নগরীর বঙ্গবন্ধু রোডের ফুটপাতের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। এ সময় তার সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) কাউন্সিলর ও মহানগর যুবদলের আহবায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার, বিশিষ্ট ঠিকাদার ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আবু সুফিয়ান, শহীদুল্লাহসহ নাসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কয়েকশ’ সমর্থক ছিলেন। এ সময় শহরের ডিআইটি থেকে গ্রিন লেইজ মোড় পর্যন্ত ফুটপাতে হকাররা বসার প্রস্তুতি নিলে আইভী সমর্থকরা লাঠিসোটা নিয়ে তাদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দিতে থাকেন। একপর্যায়ে আইভী ও তার সমর্থকরা নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে ফুটপাতে বসা হকারদের ধাওয়া দেয়।
এ সময় হকাররা একত্রিত হয়ে আইভী সমর্থকদের ধাওয়া দেয়। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা হকারদের ওপর গুলিবর্ষণ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সুযোগে যুবদল নেতা কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার ও বিএনপি নেত্রী প্যানেল মেয়র বিভা হাসানের নেতাকর্মী ও আইভী সমর্থরা হকারদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ানকে হকারদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে। হকাররা পিছু হটে শহরের চাষাঢ়া শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থান নেয়। এ সময় যুবলীগ নেতা নিয়াজুল ইসলামকে একা পেয়ে আইভী সমর্থকরা তাকে বেদম মারধর করে তার লাইসেন্স করা অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায় জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন গেলে তাকেও মারধর করে আইভীপন্থীরা। এ খবর ছড়িয়ে গেলে আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনুসহ যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে হকারদের পক্ষে অবস্থান নেন। শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চাষাঢ়া গোল চত্বরে পুলিশ প্রায় ২৫-৩০ রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়ে। এরপর কাছেই অবস্থিত রাইফেলস ক্লাব থেকে গোলচত্বরে যান শামীম ওসমান। এ সময় পুলিশ সরে গেলে শামীম ওসমান লোকজন নিয়ে চাষাঢ়ায় হক প্লাজার সামনে অবস্থান নেন। তখন হকারসহ অন্যরা শামীম ওসমানকে একের পর এক নালিশ দিতে থাকেন। শামীম ওসমান তখন বলেন, আমি এর বিচার আল­াহকে দেব। আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। আমাদের প্রচুর লোকজনদের মেরে আহত করা হয়েছে। আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিইনি। এদিকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বাÍক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পরে এ ব্যাপারে প্রেস ব্রিফিং করে বিস্তারিক জানানো হবে বলে জানান তিনি। শামীম ওসমান আমাকে মারতে চায়- আইভী : ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে এসে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, শামীম ওসমান প্রতিবছর মানুষ না খুন করলে তার মাথা গরম হয়ে যায়। সে আমাকে মারতে চায়। সে রাইফেলস ক্লাবে বসে তার লোকজন দিয়ে এই হামলা করিয়েছে। আইভী সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সম্পর্কেও সমালোচনা করেন। তিনি সেলিম ওসমান সম্পর্কে বলেন, তিনি মুখে বলেন এক, করেন আরেক। শামীম ওসমানকে ইঙ্গিত করে আইভী বলেন, আপনারা মালয়েশিয়া-দুবাইয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছেন। তারা কি পারেন না হকারদের জন্য ২-৪টি মার্কেট তৈরি করে দিতে। আজকের ঘটনার জন্য শামীম ওসমানকে জবাব দিতে হবে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কঠোর সমালোচনা করে আইভী বলেন, তারা সেলিম ওসমানের উইজডম অ্যাটায়ার্সে গিয়ে বৈঠক করে। অথচ সিটি কর্পোরেশনের কোনো সভায় তাদের আনা যায় না। তারা প্রজাতন্ত্রের নয় বরং ওসমান পরিবারের তাঁবেদার। আমি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রত্যাহার দাবি করছি। আমি নারায়ণগঞ্জের মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে গিয়েছি- শামীম ওসমান: আইভীর অভিযোগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শামীম ওসমান বলেন, আইভী আমার প্রতিপক্ষ না। আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না। আইভীর বক্তব্য অনেকটাই জামায়াত-বিএনপির বক্তব্যের অনুরূপ।
শামীম ওসমান বলেন, ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার কারণে মানবতার মা হিসেবে সারা পৃথিবীতে যাকে মাদার অব হিউমিনিটি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, সেই জননেত্রী শেখ হাসিনার দেশে যেখানে একনেকের মিটিংয়ে নেত্রী পরিষ্কারভাবে বলেছেন, কোনো জায়গায় পুনর্বাসন ছাড়া কোথাও কোনো উচ্ছেদ চলবে না। সেখানে আমরা বলিনি, নারায়ণগঞ্জের হকাররা নিয়মিত বসবে। আমি বলেছি, আগামী ২-৪ দিনের মধ্যেও যদি সম্ভব হয়, হকারদের সুযোগ দেন, যাতে অন্তত তারা পুঁজিটা সংগ্রহ করে বিকল্প কিছু করতে পারে। আমি চাই না বাংলাদেশে কোনো ফুটপাতে হকার থাকুক, বা বস্তি থাকুক। রাজনীতি যেহেতু করি, যদি গরিব মানুষের পক্ষে কথা বলতে না পারি, তাহলে রাজনীতি করা উচিত না। আমরা গরিব মানুষের পক্ষে ছিলাম, আছি ও থাকব। শামীম ওসমান আরও বলেন, প্রশাসন যেভাবে হকারদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে, আমি দৌড়ে গেছি একটাই কারণে, আমার পার্টির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আমাকে ফোন করে বলেছেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। আমি না গেলে গণ্ডগোল আরও বড় হতো। আমি কষ্ট করে হলেও তাদের বুঝিয়েসুঝিয়ে যেভাবেই হোক আমি সেখান থেকে সবাইকে ফেরত নিয়ে এসেছি। কারণ এটা একটা মানবিক বিষয়। প্রশাসনের সহায়তার ব্যাপারে শামীম ওসমান বলেন, প্রশাসন যদি আমার পক্ষে হতো, তাহলে তো প্রশাসন হকারদের ওপর গুলি ছুড়ত না। মেয়র কি এটা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন। তিনি ৪০০ লোকের মিছিল নিয়ে এসছেন বিএনপির লোকদের সঙ্গে নিয়ে। আর এটাই স্বাভাবিক, পুলিশ সব সময় শক্তিশালী লোকের পক্ষে কাজ করে। মেয়র আইভী শক্তিশালী। যদিও মেয়র আইভীর দাবি আমি ক্ষমতাবান, তবে আমি জনগণের শক্তিকেই নিজের শক্তি মনে করি। আজ ২৫ দিন ধরে হকাররা রাস্তায় ঘুরছে। যদি কোনো বিকল্প থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই হকাররা ২৫ দিন ধরে রাস্তায় ঘুরত না। আহত চারজন ঢামেক হাসপাতালে: সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ আহত ৪ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন- জসিম উদ্দিন (৩৫), জাহাঙ্গীর আলম (৬৫), নাসির হোসেন (৫২) ও কবির মিয়া (৩৮)। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে তাদের ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে নাসির হোসেনের শরীরে একাধিক শটগানের গুলি রয়েছে। অন্যরা ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রতিষ্ঠাতা: মরহুম কাজী মো: রফিক উল্যাহ, সম্পাদক: ইয়াকুব নবী ইমন, প্রকাশক: কাজী নাজমুন নাহার। সম্পাদক কর্তৃক জননী অফসেট প্রেস, ছিদ্দিক প্লাজা, করিমপুর রোড, চৌমুহনী, নোয়াখালী থেকে মূদ্রিত।
বার্তা, সম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ছিদ্দিক প্লাজা(৩য় তলা উত্তর পাশ), করিমপুর রোড, চৌমুহনী, নোয়াখালী। মোবাইল: সম্পাদক-০১৭১২৫৯৩২৫৪, ০১৮১২৩৩১৮০৬, ইমেইল-:: jatiyanishan@gmail.com, Emonpress@gmail.com
Developed By: Trust soft bd