January 6, 2017
আজ ৭ জানুয়ারী: বেগমগঞ্জের রাজনীতির কালো অধ্যায়

ইয়াকুব নবী ইমন: আজ ৭ জানুয়ারী নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজনীতির কালো অধ্যায়ের দিন। ২০১৪ সালের এই দিনে উপজেলার চৌমুহনী শহরে অবরোধকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে চলাকালে পুলিশ-বিজিবি’র গুলিতে ব্যবসায়ী  মিজানুর  রহমান রুবেল, দিনমজুর মহিন উদ্দিন ওরফে মহসিন ও পায়ে পৃষ্ঠ হয়ে অজ্ঞাত এক শিশু নিহত হয়। পুলিশ সহ আহত হয় শতাধিক  অবরোধকারী। এ সময় ৬টি মটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামী করা হয় চারদলীয় জোটের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার নেতাকর্মীকে। ঘটনার দীর্ঘ ৩ বছর পরও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের কান্না থামেনি। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবরও তেমন কেউ নেয়না। নিহতরা সবাই নিরপরাধ হলেও ঘটনাটি ভিন্নখাতে নিতে তখন প্রশাসন তাদেরকে বিরোধী দলীয় জোটের সমর্থক বলে অখ্যায়িত করে। তবে তখন বিরোধীজোটের পক্ষ থেকে নিহতদের নিজেদের কর্মী দাবী করে পায়দা লুটার চেষ্টা করা হয়। আদতে তারা কেউ  কোন রাজনৈতিক কর্মী ছিলনা। রুবেল ছিল ব্যবসায়ী ও মহসিন ছিল শ্রমজীবী বাবুর্চি । বিষয়টি নিয়ে এখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা ও চৌমুহনী শহরের সচেতন মহল।
বিগত ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারী বিকালে ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা অবরোধের সমর্থনে চৌমুহনীতে মিছিল বের করে। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন চৌমুহনী পৌর বিএনপির সভাপতি জহির উদ্দিন হারুন ও  জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক কামাক্ষা চন্দ্র দাস। মিছিলটি চৌমুহনী রেলওয়ে গেইট অতিক্রম করতে গেলে বেগমগঞ্জ মডেল থানার তৎকালিন টিএসআই সাইফুল সিকদার ও পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জিসান আহমেদের নেতৃত্বে বাধা দেওয়া হয়। এ সময় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের কিছু উশৃঙ্খল নেতাকর্মী পুলিশকে মারধর ও তাদের ধাওয়া করে। উত্তেজিত শত শত অবরোধকারী চৌমুহনী শহরে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তারা এক সাংবাদিকের ও পুলিশের ২টি সহ মোট ৬ টি মটর সাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বড় বড় বৈদ্যুতিক পিলার ফেলে সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। এ সময় অবরোধকারীরা ডালিয়া সুপার মার্কেট, হাজী মার্কেট, হোসেন মার্কেটসহ ৪-৫টি মার্কেট ভাংচুর করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ  ও বিজিবি এসে ফাকা গুলি করলে ৮ জন অবরোধকারী গুলিবিদ্ধ সহ শতাধিক আহত হয়। গুলিবিদ্ধমেধ্যে ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান রুবেল, দিনমজুর মহিন উদ্দিন ওরফে মহসিন, অবরোধকারী জাহাঙ্গীর আলম, পলাশ, জহির ও সবুজকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার রুবেল ও মহসিনকে মৃত ঘোষনা করেন। আহতদের মধ্যে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি(তদন্ত) জসিম উদ্দিন, চৌমুহনী পুলিশ ফাড়ির তৎকালিন ইনচার্জ জিসান আহম্মদ, চৌমুহনীর তৎকালিন টিএসআই সাইফুল সিকদারও ছিলেন। এদিকে নিহত রুবেল ও মহসিনকে নিয়ে শুরু হয় প্রশাসন ও বিরোধী জোটের রাজনীতি। প্রশাসন নিহতদের বিরোধী জোটের কর্মী-সমর্থক দাবী করলেও নিহতদের পরিবারের সদস্য বলেছেন তারা কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলনা কখনো। রুবেল ছিল ব্যবসায়ী আর মহসিন ছিল দিনমজুর বাবুর্চি। অপরদিকে নিজেদের দুই কর্মী নিহত হয়েছে দাবী করে পর দিন ৮ জানুয়ারী জেলায় সকাল-সন্ধা হরতাল পালন করে ২০ দলীয় জোট। এই ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে ২০ দলীয় জোটের সাড়ে ৩ হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা দায়ের করে। ঘটনার কিছু দিনপর তখনকার বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি আইনুল হক, টিএসআই সাইফুল ইসলাম সিকদার ও পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জিসান আহমদকে বদলি করা হয়।
এদিকে পুলিশ-বিজিবির গুলিতে নিহত ৩ জনের পরিবারের সদস্যদের গত ৩ বছরেও তেমন কেউ খোঁজ খবর নেয়নি। তাদের পরিবারের সদস্যদের কান্না এখনো থামেনি।
নিহত রুবেলের শুন্যতা এখনো পিড়া দেয় তার পরিবারের সদস্যদের। তারা ভূলতে পারছেননা রুবেলের ম্মৃতি। পুত্র হারিয়ে রুবেলের  শোকাহত পিতা চৌমুহনীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে শহর ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি রুবেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবী করেন।
নিহত মহসিন ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার অনুপস্থিতিতে অসহায় পরিবারটি অর্ধহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছে। হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলা কি অবস্থা তাও তারা জানে না। মহসিনের পিতা খুরশিদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ছেলে কোন রাজনীতি করতো না। সেদিন এমপি সাহেবের একটি অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়িতে আসার সময়  গোলাগুলিতে পড়ে আমার ছেলে নিহত হয়। তিনি বলেন, আমি দুনিয়ার কোন আদালতে ছেলে হত্যার বিচার চাইনা, আখেরাতে আল¬াহর কাছে ছেলে হত্যার বিচার চাইবো।
শুক্রবার দুপুরে মামলাটির বর্তমান অবস্থা জানতে বেগমগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) সাজিদুর রহমান সাজিদের সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন, উক্ত মামলার আসামীরা জামিনে আছেন। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
উল্লে¬খ্য, বেগমগঞ্জের রাজনীতির ইতিহাসে এটিই সব ছেয়ে বড় রাজনৈতিক সহিংসতা। এই সহিংসতার জন্য দায়ী রাজনৈতিক কর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবী সচেতন মহলের।

Spread the love
আরো খবর


প্রতিষ্ঠাতা: মরহুম কাজী মো: রফিক উল্যাহ, সম্পাদক: ইয়াকুব নবী ইমন, প্রকাশক: কাজী নাজমুন নাহার। সম্পাদক কর্তৃক জননী অফসেট প্রেস, ছিদ্দিক প্লাজা, করিমপুর রোড, চৌমুহনী, নোয়াখালী থেকে মূদ্রিত।

বার্তা, সম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ছিদ্দিক প্লাজা(৩য় তলা উত্তর পাশ), করিমপুর রোড, চৌমুহনী, নোয়াখালী। মোবাইল: সম্পাদক-০১৭১২৫৯৩২৫৪, ০১৮১২৩৩১৮০৬, ইমেইল-:: jatiyanishan@gmail.com, Emonpress@gmail.com