অশান্ত সোনাইমুড়ী: অপরাজনীতির বলি সাধারণ মানুষ

ইয়াকুব নবী ইমন, সোনাইমুড়ী থেকে ফিরে:
দিন দিন অশান্ত হয়ে উঠছে জেলার উত্তরাঞ্চলের উপজেলা সোনাইমুড়ী। সেখানে অপরাজনীতির বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রায় প্রতি দিনই উপজেলার কোথাও না কোথাও হামলা, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক বিবাদমান দুটি গ্রুপ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনও পড়েছে বেকায়দায়। স্বসস্ত্র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বা বিভিন্ন সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় জড়িতরা রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকায় প্রশাসন ইচ্ছে করলেই কোন অপারধীদের গ্রেফতার করতে পারছেনা। ফলে রাজনৈতিক সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে সোনাইমুড়ীর মানুষ। এই অবস্থা চলতে থাকলে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ফুসে উঠতে পারে সাধারণ মানুষ।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, বিগত কয়েক দিন থেকেই সোনাইমুড়ীতে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছে। এখানে বর্তমান এমপি এ এইচ এম ইব্রাহিম ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের গ্রুপের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিলো। সম্প্রতি জেলা আওয়ামীলীগের এক সভায় জাহাঙ্গীর আলমকে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ঘোষনা করা হয়। মূলত এই ঘোষনার পর পরেই দুই রাজনৈতিক নেতার নেতাকর্মীদের মধ্যে মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। মাঠ দখলের রাজনীতিতে সবর হয় দুই পক্ষই। ফলে তা অনিবার্য সংঘাতে রূপ নেয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলাকালে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধায় সোনাইমুড়ী বাজারে এমপি ইব্রাহিম গ্রুপ ও জাহাঙ্গীর গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে ১৭ সেপ্টম্বর সোনাইমুড়ী থানার ওসি আব্দুস ছামাদ উভয় পক্ষকে থানায় শাীলসি বৈঠক ডেকে সমাধানের আশ্বাস দেন। সেই মোতাবেক যথারিতি থানায় বৈঠক শুরুর সাথে সাথে ১৫-২০ জনের একটি গ্রুপ থানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই এলোপাতাড়ি ককলেট, বোমা নিক্ষেপ ও গোালাগুলি শুরু করে। এতে ত্রিমুখি সংঘর্ষে সোনাইমুড়ী থানার ওসি আব্দুস ছামাদ ও কনটেস্টেবল জসিম উদদীনসহ চার পুলিশ সদস্য ও উপজেলা স্বেচ্চাসেবকলীগের আহ্বায়ক আবু ছায়েমসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়। একই সময় বিপ্লব (২৫) নামের এক পথচারী গুলিবিদ্ধ। এক পর্যায়ে এই সংঘর্ষ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবু ছায়েম আহত হওয়ার ঘটনায় তার কর্মী-সমর্থকরা বাজারে এলোপাথাড়ি ভাংচুর ও লুটপার করে বলে অভিযোগ উঠে। এ সময় সোনাইমুড়ী পৌর কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম জহিরের অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাস কাউন্টারসহ বিভিন্ন মানুষের অর্ধশত দোকান ঘর ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। এ ঘটনায় সোনাইমুড়ী থানার একাধিক মামলা হয়েছে। পুলিশ ছাত্রলীগ যুবলীগের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবু ছায়েম পুলিশকে বিষদাগার করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিএনপি ও জামায়াত থেকে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদানকারী কিছু চিহ্নিত সন্ত্রসী দলীয় নেতাকর্মীদের উপর হামলা করে দলে ও এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আসছে। এরা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। পুলিশ এদের গ্রেফতার না করে সমঝোতার মাধ্যমে মাদক ব্যবসাসহ অন্যন্য অপরাধ কর্মকান্ডে নীরব ভুমিকা পালন করছে। বিশৃঙ্খলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
আবু ছায়েমের সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকরা সোনাইমুড়ী থানার ওসি আবদুস সামাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ছায়েমের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কার লোক আমাদের উপর হামলা করেছে তা সবাই দেখেছে। আমরা সেদিন অনেক ধৈর্য ধরেছি। এ ঘটনায় ছায়েম বাদী হয়ে যে অভিযোগ করেছে সেই অভিযোগ আমরা গ্রহন করেছি। পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছে। বাজারের ব্যবসায়ীদের উপর হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় কেউ অভিযোগ দিলে তাও মামলা হিসেবে রেকর্ড হবে। পুলিশ কারো কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে কাউকে ছাড় দিচ্ছেনা।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়, আবু ছায়েমের দায়ের করা মামলায় অনেক নীরিহ বা যারা ঘটনার সময় বাজারে ছিলেননা তাদেরকে আসামী করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধেও। পুলিশ বিনা অন্যায়ে নিরপরাধ অনেক ছাত্রলীগ যুবলীগ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক সংঘাত চলাকালে নিরপরাধ লোকজন, পথচারী, ব্যবসায়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় বাজারে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই সংঘাত চড়িয়ে পড়ছে উপজেলার প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলেও। অপরানীতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এরিমধ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর উপজেলার জয়াগ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগের এক গ্রুপের হামলা অন্য গ্রুপের অন্তত ৫ জন আহত হয়েছে। এসময় হামলাকারীরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিসসহ তিনটি দোকান ভাঙচুর এবং একটি মোটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে। জয়াগ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনের ফলাফলকে নিয়ে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। এর জের ধরে স্কুল কমিটির সদ্য নির্বাচিত সদস্য ও জয়াগ ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম ও মহিন উদ্দিন বিকম এর উপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা সাখাওয়াত, কুদ্দুস,শান্ত, বাদল এর নেতৃত্বে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ১৫-২০ জন যুবক হামলা চালায়। এই ঘটনায় নির্বাচিত সদস্য শফিকুল ইসলাম, মহি উদ্দিন, রিয়াজ, মিজানসহ ৫ জন আহত হয়। হামলার শিকার ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম জানান, হামলার সময় তার মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। আমি এর মানে বুঝতেছিনা। নির্বাচন সুস্থ্য ও সুন্দর ভাবে হয়েছি। কিন্তু একটি মহল বিষয়টিকে নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাদের ইন্দনেই এই হামলা ঘটনা ঘটে।

অপরদিকে সোনাইমুড়ীর রাজনৈতিক সংঘাত ব্যহত করছে সামাজিক নিরাপত্তাকেও। এই সংঘর্ষের ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে সোনাইমুড়ীতে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত অনেক নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সবাই পরিবার পরিজন নিয়ে উদ্বিগ্ন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিকালে কলেজ ছাত্রীর উপর হামলার ঘটনা তাই প্রমাণ করে। নাওতলা গ্রামের খোরশেদ আলম রতনের কন্যা ও পৌর এলাকার ভানুয়াই গ্রামের জহিরুল ইসলাম জহির কমিশনারের পুত্র বধু রিয়াজ ভূইয়ার স্ত্রী খাদিজা আক্তার বিন্তু কলেজ থেকে রিকসা যোগে নাওতলায় গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারী রিকশাটি মোমিন কমিশনারের বাড়ীর সামনে পৌছালে হেলমেট ও মুখোশ পরিহিত ৩ যুবক রিকশার গতি রোধ করে চালককে মারধর করে কলেজ ছাত্রীকে জোরপূর্বক তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ছাত্রীটি চিৎকার দিলে সন্ত্রাসীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
আহত কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার বিন্তু জানান, আমার স্বামীর সাথে রাজনৈতিক বিরোধের জেরেই সন্ত্রাসীরা এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা সন্ত্রাসীদের বিচার চাই।
আহত কলেজ ছাত্রীর পিতা খোরশেদ আলম রতন বলেন, মেয়ের শশুর পক্ষের সাথে রাজনৈতকি বিরোধ থাকতেই পারে। আমার মেয়েতো কোন রাজনীতি করেনা বা কোন অন্যায় করেনি। তাকে কেন কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হলো। আমরা প্রশাসনের কাছে ন্যায় বিচার চাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোনাইমুড়ী বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, রাজনৈতিক মাঠে সংঘাত সংঘর্ষ হতেই পারে, তাই বলে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হবে কেন। সোনাইমুড়ীতে এর আগেও তো রাজনীতি ছিলো তখনতো এমন ঘটনা তেমন ঘটেনি। যারা রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে আমরা তাদের ঘৃনা করি। হামলা ও সংঘর্ষের সময় যে সব দোকান ঘরে হামলা ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে আমরা এর নার্য ক্ষতিপূরন চাই। না হয় বাজারের ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করলে এসব লুটেরার দল কথিত রাজনৈতিক নেতারা বাজার থেকে পালানোর পথ পাবেনা। ব্যবসায়ীরা শান্তি চায়, তারা প্রশাসনের কাছে ন্যায় বিচার দাবী করেছেন।
সোনাইমুড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগের একাধিক নেতাকর্মী জানান, আমাদের এমপি ইব্রাহিম ও জাহাঙ্গীর আলম কেউ গ্রুপিং রাজনীতিকে পচন্দ করেননা। কিন্তু তাদের কিছু অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থক আছে যাদের কারনে এই দুজনের বদনাম হচ্ছে। আমরা চাই সোনাইমুড়ীর রাজনীতিতে সহাবস্থান। একটি পক্ষ আছে তারা গ্রুপিং করে নিজেদের আখের গোচাতে চায়। এখনই এদের চিহিৃত করে দল থেকে বহিস্কার করলে সোনাইমুড়ীতে আর কোন সাধারণ মানুষ অপরাজনীতির শিকার হবেনা বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে স্থানীয় এমপি এএইচ এম ইব্রাহিম ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের মোবাইলে একাধিক বার কল করলেও তাঁরা রিসিভ করেননি।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *