নতুন বছরে জনগণের প্রত্যাশা এবং নতুন সমীকরণ

আবুল খায়ের: ‘যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি’-রবিগুরু’র এই বাণীকে অন্তরে ধারণ করতে পারলে জীবনের গতিধারা বুঝতে সহজ হয়। দেখতে দেখতে আরো একটা বছর বিদায় নিল আমাদের জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে। অনেক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণকে পিছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যাব এক নতুন প্রত্যাশার আলোক বর্তিকাকে সামনে নিয়ে। বিগত বছরের হতাশা, ব্যর্থতার গ্লানি এবং ভুলগুলোকে পায়ে ঠেলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য ৩১ ডিসেম্বর রাত্রে সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম। সে মহেন্দ্রক্ষণ পার হয়ে নতুন বছরে পা রেখে সব কিছুকে এক নতুনভাবে আবিস্কার করার প্রয়াসে ব্রতি হতে কে না চায়? বলা যায়-সবাই প্রস্তুত।
অফিস-আদালতে নতুন ক্যালেন্ডার, নতুন ডায়েরি, নতুন কর্মপরিকল্পনা। দোকানিরা নতুন হিসাবের খাতা, নতুন রেজিস্ট্রার, হালখাতা, নতুন কাস্টমার টার্গেট ইত্যাদি শুরু করেন। নতুন স্কুল/কলেজে নতুন ক্লাশে ভর্তি, বই, খাতা, বন্ধু-বান্ধব, পরিবেশ, ক্যাম্পাস, জামা-কাপড় ইত্যাদি সবই নতুন। চারিদিকে এ এক নতুনের কেতন। নতুন বছরে নতুন বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীরা যেমন আনন্দে আত্মহারা। নতুন ক্লাশে নতুন বইয়ের গন্ধ, ছবি ও নতুন পাঠপরিকল্পনা সবই শিক্ষার্থীদের মনে নতুন কিছু শেখার প্রতি আগ্রহ আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এক নতুন অনুভূতি ও রোমাঞ্চ নিয়ে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যায় আরো এক ধাপ। আবার বানান ভুল, ভুল তথ্য’সহ নানান রকমের ভুলে ভরা বই, নি¤œমানের কাগজে প্রিন্ট ও মান নিয়েও সমালোচনার অন্ত নেই।
স্কুল/কলেজগুলোতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, নবীনবরণ, নতুনদের স্বাগত জানিয়ে হরেক রকমের আয়োজন, সাজ সাজ মুখর ক্যাম্পাস। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যালেন্ডার ঠিক করেন, কিভাবে সারাটা বছর কাটানো যাবে। তবে সেই ক্যালেন্ডার যতো জনবান্ধব হবে ততোই জনগণ তার সুফল পাবে। অন্যথায় কেবল ভোগান্তিই আছে জনগণের ভাগ্যে। সরকারী দল ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার প্রয়াসে চেষ্টারত থাকবে আর বিরোধী দল ক্ষমতায় যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ও অব্যাত প্রচেষ্টা করবে এটাইতো স্বাভাবিক। রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারও সেইভাবে ঠিক করা হবে। তবে জনগণের সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত সকল দলের নীতিনির্ধারকদের। এটাই আপাময় জনগণের প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ, পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা, বিশ^াস ও সহযোগিতার মনোভাব যতো বেশি হবে, তবেই আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবো। বিভিন্ন দেশে যেভাবে দিন দিন ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। তাতে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। নতুন বছরে এই যুদ্ধ ভাবাপন্ন দেশগুলো তাদের মনোভাব পরিবর্তন করবে। এটাই সকল দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসকদের মনোভাব প্রায় একই রকম থাকে, আবার সাধারণ জনগণের মনোভাব থাকে আরেক রকম অর্থাৎ প্রায় এক ও অভিন্ন। শাসকরা একদিকে দেশকে পরিচালিত করতে চায়, আবার জনগণের মনোভাব কিন্তু সব সময় শাসক শ্রেণির সাথে যায় না। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। তবে শাসকদের মনোভাব যতো বেশি জনগণের মতের সাথে যাবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। এই সমীকরণ বুঝতে চেষ্টা করা দোষের নয়। তবে অনেকেই বুঝেও না বুঝার ভান করার কারণে জনগণের মনো কষ্টই কেবল বাড়ে না, বর্হিবিশে^ একটি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্তের কারণও হয়।
পুরাতন বছরের অনেক ব্যর্থতা যেমন আছে, আবার অনেক সফলতার রেকর্ডও আছে। ব্যর্থতাকে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে মেনে নিয়ে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো যথাসম্ভব পরিহার করার মানসিকতা থাকতে হবে। যেসব সফলতা আছে সেইগুলোকে আরো সফলতার সাথে ব্যবহার করে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। আইন শৃঙ্গলা, অপরাধ দমন, নারী ও শিশু নির্যাতন, গুম-হত্যা, চুরি-ছিনতাই, সাইবার ক্রাইম, পারিবারিক অপরাধ’সহ যাবতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। মেয়াদোত্তীর্ণ বা নকল ঔষধ বিক্রি, ভুয়া ডাক্তার, ভুল চিকিৎসা, ডিগ্রীবিহীন ডাক্তার, লাইসেন্স বিহীন ডায়াগ্নস্টিক সেন্টার, ডাক্তারদের মতো সেবাধর্মী পেশাজীবীদের ধর্মঘট ইত্যাদি থেকে জনগণকে রেহাই দিতে হবে। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখার মাধ্যমে জনবান্ধব পরিবেশ সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। প্রশ্ন ফাঁসে শিক্ষা ব্যবস্থা যেন ফেঁসে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিকে হত্যার মাধ্যমে যেন বুদ্ধিজীবী হত্যা অব্যাহত আছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ, ভুলে ভরা বই রোধ করতে হবে। প্রশ্ন ফাঁস’সহ যাবতীয় অপরাধকে শূণ্যের কোঠায় আনতে হবে। মানসম্পন্ন ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় ও ব্যবস্থাপনায় যৌক্তিক পরিবর্তন সময়ের দাবি। নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়ক ও সময় উপযোগি কারিকুলাম তৈরী করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে হবে।
মাদকের করাল গ্রাস থেকে যুব সমাজকে বাঁচাতে হবে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল’সহ সব ধরনের ভয়াবহ মাদকের সহজ লভ্যতা বন্ধ করতে হবে। মাদকের হাত থেকে তরুণদের রক্ষা করতে না পারলে মাদকে আসক্ত ও অর্থব্য যুবসমাজ দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়ন হবে (?)। ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতি ও অর্থ পাচার রোধ করে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা প্রদান, ব্যাংকে অর্থ লগ্নি লাভজনক ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি দস্যু, বনদস্যু, খাল ও হাওড় দস্যুদের হাত থেকে খাস জমি রক্ষা করা ও ভূমিহীন প্রান্তিক চাষীদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। সকল পর্যায়ে ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি রোধকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্বাধীনতার চেতনার বাস্তবায়নে চাই কার্যকর পদক্ষেপ। সকল ধরণের বৈষম্য ও নৈরাজ্য দূর করে দারিদ্রতার করাল গ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করার ব্রতি হতে হবে।
কলেজ/ভার্সিটিতে সহঅবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষার্থীদের বহুদিনের দাবিপূরণ হবে। ডাকসু’সহ সকল ছাত্র সংসদগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরীতে অনুকুল ও সহায়ক পরিবেশ তৈরী করে দিতে না পারলে অচিরেই মেধাহীন ও নেতৃত্বশূন্য হওয়ার দিকে জাতি এগিয়ে যাবে। ভর্তিসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরণের অনিয়ম ও জালিয়াতি বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মেধার সঠিকতা যাচাই সাপেক্ষে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মচারি ও শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনিয়ম কমে যাবে। আর অনিয়ম রোধ করতে পারলে সাধারণ পরিবারের মেধাবীরা পড়ালেখার যেমন সুযোগ পাবে, তেমনি চাকুরির ক্ষেত্রেও আরো এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুত’সহ সকল প্রকার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখা সাধারণ জনগণের নূন্যতম প্রত্যাশা মাত্র। এর ব্যতিক্রম হলে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্য’সহ অনেক দেশেই জনশক্তি রপ্তানি কমে গেছে। বিভিন্ন দেশের সাথে কুটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আলোচনা সাপেক্ষে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার। রেমিট্যান্স/বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য নতুন নতুন দেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ব্যবস্থা করতে পারলে বেকারত্ব কমানো যাবে। কমখরচে যাতে বিদেশ যেতে পারে এবং প্রতারকদের প্রতারণার হাত থেকে যেন রক্ষা পেতে পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরণের শিল্প কারখানা গড়তে না পারলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। শিক্ষিত যুবকদের কৃষি/মৎস চাষে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে না পারলে যুবসমাজ মাদকে আসক্তি’সহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাবে। ফলে সমাজে নানা রকমের নৈতিক স্খলন ও সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিবে। কারিগরী ও কর্মমুখি শিক্ষা ব্যবস্থা বাড়াতে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা দরকার। যেকোন ধরণের ধর্মঘট, হরতাল, অবরোধ ও যানজট বিহীন ও দুর্ঘটনামুক্ত রাস্তাঘাট, দুর্গন্ধ ও দূষিত বায়ুমুক্ত শহর, জনগণ আশা করতেই পারে।
যেহেতু এই সরকার স্বাধীনতার পক্ষের সরকার। সেজন্য এই সরকারের প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাশার মাত্রাও একটু বেশি থাকাই স্বাভাবিক। দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং উন্নয়ন অব্যাহত রাখার কোন বিকল্প নেই। অনিয়ম ও দুর্নীতির মতো ব্যাধিকে রোধ করতে না পারলে সার্বিক সাফল্য অর্জন কখনও সম্ভব নয়। বৈশ^য়িক ঝুঁকি মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে দেশের নীতি নির্ধারকদের।
বিশ^ বিবেককে জাগ্রত রাখতে পারলেই আসবে পরিবর্তন। যার যার অবস্থানে থেকে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে না পারলে জাতি কখনও অগ্রসর হতে পারবে না। তবে যতই শঙ্কা ও আতঙ্ক থাকুক না কেন, আমরা একটি সুন্দর বছর আশা করতেই পারি। পদ্মা সেতু’সহ মেঘা প্রকল্পসমুহ আলোর মুখ দেখলে জনগণ সুফল পাবে। আমার লেখা কবিতার কিছু চয়ন দিয়ে শেষ করছি- ‘আজকের দিন মনে হচ্ছে কঠিন/আগামীকাল হবে কঠিনতর?/আমি বলি-না/আসছে পরশু হবে আরো সুন্দর’।

পরিশেষে-আমরা কেবল মাত্র বিজয়ের মাস শেষ করলাম। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যেসকল কলম সৈনিক প্রতিবাদী মনোভাব বা লেখনী’র জন্য গুম হয়েছিলেন অথবা প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁদের প্রতি বিনম্্র শ্রদ্ধা ও রক্তিম সালাম জানাচ্ছি। স্বাধীনতার চেতনায় ভরে উঠুক চারিদিক। যাঁদের অপরিসীম মেহনতে সিক্ত হয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে নব উদ্যমে দেশ অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির দিকে, তাঁদের প্রতি অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা ও যারপর নাই ভালোবাসা জানাচ্ছি। মানবতার বিজয় নিশান পূর্বাকাশে ঢেউ তুলে উড়তে থাকুক। সকল জরা ও ক্লান্তিকে পিছনে পেলে এগিয়ে যাব সবাই এক নব দিগন্তে। লেখকঃ কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *