হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ!

ইয়াকুব নবী ইমন: ”শীত মানেই মজার মজার পিঠা-ফুলি খাওয়া, শীত মানেই খেজুরের রসের ফায়েশ-শিন্নী পাওয়া”। এমন মিষ্টি মধুর পিঠা-ফুলি, ফায়েশ-শিন্নী তৈরীতে যে খেজুরের রস ব্যবহার হয় সেই রসের উৎস খেজুর গাছ নোয়াখালীর গ্রামাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলে যেসব খেজুর গাছ রয়েছে সেগুলোর রস সংগ্রহেও গাছির(গাছ কাটা ব্যক্তি) সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় পাওয়া যাচ্ছেনা কাঙ্খিত খেজুরের রস।
বর্তমান আবহাওয়ায় কুয়াশায় ভর করে আসছে হিম শীতল শীতকাল। নোয়াখালীর গ্রামাঞ্চলের প্রকৃতিতে শোভা পাচ্ছে নতুন রূপ। শীত কালে ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা-ফুলি, পায়েশ-শিন্নী খাওয়ার ধুম। এ সব পিঠা-ফুলি তৈরির প্রধান উপাদান খেজুরের রস ও গুড়। তাই শীতকালে খেজুর গাছের কদর বেড়ে যায়। শীতকে কেন্দ্র করে খেজুর গাছের গুরুত্ব বাড়লেও গ্রামাঞ্চলে কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। আগের মত বাড়ির আশেপাশে ও সড়কের পাশে খেজুর গাছের দীর্ঘ দৃশ্য দেখা যায়না। প্রায় বিলুপ্তির পথে রসের এই বহুবিধ ব্যবহারের মূল্যবান গাছটি। রস সংগ্রহের মৌসুম শীত কালে গাছির(গাছ কাটা ব্যক্তি) সংকট তীব্র। মূলত জেলায় শীত আসার আগেই শুরু হয় খেজুর গাছের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। খেজুর গাছের রস সংগ্রহের পদ্ধতিটিও চমৎকার। গাছের কান্ডের উপরিভাগের যে অংশ থেকে কছি ডগা ছড়িয়ে পড়ে সে অংশের কিছুটা নিচে ধারালো দেশীয় অস্ত্র (ছেনি) দিয়ে ভালো ভাবে চিরে দিতে হয়। এরপর এতে বাঁশের নল ঢুকিয়ে দিতে হয়। তারপর সেই নল দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রস পড়তে থাকে। গাছিরা প্রতিদিন বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত খেজুর গাছে মাটির বা অন্যান্য উপাদানে তৈরী কলস বেঁধে রাখে। রাত ভর ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ে ভর্তি হয়ে কলস। ফজরের নামাজের পর গাছিরা শীতকে উপেক্ষা করে কাঙ্খিত সেই রস সংগ্রহ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে গাছের মালিককে দিতে হয় অর্ধেক রস। বাকি অর্ধেক রস গাছি নিয়ে নিজের চাহিদা মেটানোর পর কলসীতে করে শীতের সকালে শহর ও গ্রামে বিক্রি করে। প্রতি কেজি খেজুরের রসের দাম ৪০-৫০ টাকা। খেজুরের রস ছোটবড় সব মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এছাড়া এ রসের অনেক ঔষুধী গুণাগুণও রয়েছে। এটি মানবদেহে কাশি নিবারক হিসেবে কাজ করে। তবে গ্রামাঞ্চলে বা শহরে আগের মতো খেজুরের রস পাওয়া যায় না। খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে খেজুর রস। ফলে সুস্বাদু রস ও গুড়ের রকমারি পিঠাও হারাতে বসেছে।
বর্তমানে জেলা সদর, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, সেনবাগ, সোনাইমুড়ী উপজেলায় খেজুর গাছ নেই বললেই চলে। তবে কোম্পানীগঞ্জ, সুবর্নচর, কবিরহাট ও হাতিয়া উপজেলার কিছু কিছু গ্রামাঞ্চলে এখনো খেজুর গাছের দেখা মিলে। কিন্তু গাছির অভাবে সেই সব গাছ থেকেও ঠিক মতো খেজুর রস সংগ্রহ করা যাচ্ছেনা। কারণ খেজুর গাছে উঠে গাছ কাটা, নিয়মিত রস সংগ্রহ করাও ঝুকিপূর্ন। ফলে যে কেউ ইচ্ছা করলেই খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে পারেনা।
এরপরও এখন উপকূলীয় এলাকায় যেটুকু রস ও গুড় পাওয়া যাচ্ছে অদুর ভবিষ্যতে পরিবেশ বান্ধব এ খেজুর গাছের আর দেখাই না যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা, জ্বালানি কাজে খেজুর গাছ ব্যবহার করা ও সরকারী কোন তদারকি না থাকায় এটি বিলুপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
হাতিয়া উপজেলার জাহাজমারা গ্রামের বাসিন্ধা ষাটোর্ধ গাছি রমজান আলী জানান, আমাদের এলাকায় আগের মত গাছ নেই। যেসব গাছ আছে সেগুলো থেকেও তেমন রস বের হয়না। আর দু’চারটি গাছ দিয়ে পোষায় না। ফলে এখন রস সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছি।
নোয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড.আবুল হোসেন জানান, গ্রামাঞ্চল থেকে খেজুর গাছ কমে যাওয়ার বিষয়টি সত্য। এখন অনেক উপজেলায় খেজুর গাছ দেখা যায়না। ফলে খেজুরের রসও পাওয়া যায়না। জেলার উপকূলীয় দু’একটি উপজেলায় খেজুর গাছ দেখা গেলেও তা নগন্য। আমারা গ্রাম পর্যায়ে খেজুর গাছ পোরনে স্থানীয়দের উৎসাহ দিচ্ছি এবং অনেক স্থানে সরকারী ভাবে বিনামূল্যে খেজুর গাছ সরবরাহ করছি।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *