শিরোনাম :
বেগমগঞ্জের ”মাষ্টার পাড়া এখন আর্জেন্টিনা পাড়া“  নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস পরিদর্শনে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বেগমগঞ্জে আর্থিক সংকটে বন্ধ এম এ মোতালেব হাই স্কুল বেগমগঞ্জে গৃহবধুকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা নোয়াখালী উপকূলে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর তান্ডব ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি পবিত্র সিরাতুন্নবী(স.) উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং থানায় থানায় অভিযান নিখোঁজ নওমুসলিম ফারুকের সন্ধান চেয়ে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন নোয়াখালীতে ক্রস ফায়ারে যুবদল নেতা হত্যা: ৫ বছর পর সাবেক পুলিশ সুপারসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন কিশোর গ্যাংয়ের খুনোখুনিতে রক্তাক্ত নোয়াখালী

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং থানায় থানায় অভিযান

  • আপডেট সময় : রবিবার, অক্টোবর ২৩, ২০২২
  • 117 পাঠক

জাতীয় নিশান রিপোর্টার:
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বর্তমানে কিশোর গ্যাং নোয়াখালীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জবর দখল, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ইভটিজিং ও ধর্ষনসহ বিভিন্ন অপরাধমৃলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে এসব কিশোরগ্যাং সদস্যরা। এতে করে জনমনে চরম আতংক বিরাজ করছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠা কিশোর গ্যাং এর বেপরোয়া আচরনে অনেকে ভয়ে তাদের স্কুল-কলেজ পড়–য়া মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে। অভিবাবকরা তাদের ছেলে মেয়েদের নিয়ে বর্তমানে চরম আতংকের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়,শিক্ষিত এবং অ-শিক্ষিত এসব কিশোরগ্যাং সদস্যদের বয়স ১৪ থেকে ২০বছর। স্থানীয় ভাবে কতিপয় হাইব্রিড রাজনৈতিক নেতা,জনপ্রতিনিধি,মাদক ব্যবসায়ী, কতিপয় ভুমিদস্যু ও কালো টাকার মালিকেরা তাদের স্বার্থহাসিলের লক্ষ্যে এসব কিশোরগ্যাং সদস্যদের দিয়ে কৌশলে বিভিন্ন অপরাধমুলক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এবং বিভিন্ন হাটবাজার এলাকায় লইসেন্সবিহীন মোটর বাইক, ব্যটারী চালিত রিক্সা এমনকি সিএনজি অটোরিক্সা নিয়ে হাতে থাকা মোবাইলে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে মহড়া এবং অনেক সময় দলবদ্ধ হয়ে পাঁয়ে হেঁটে মহড়া দেয়।এছাড়াও গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ও কালভার্ডের উপর বসে দলবদ্ধবাবে আড্ডা দেয়।এতে করে জনমনে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। কিশোরগ্যাং সদস্যরা তাদের বড়ভাইয়ের নির্দেশ মোতাবেক মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমৃলক কর্মকান্ডে ব্যবহ্্রত হচ্ছে। বিশেষ করে জেলার মাইজদী বাজার, মাষ্টার পাড়া,পশ্চিম অনন্তপুর,নোয়াখালী পুরাতন কলেজ এলাকা, হরিনারায়নপুর বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকা, বেগমগঞ্জের চৌমুহনী শহর, গনিপুর,করিমপুর, রমজানবিবি বাজার এলাকা, চৌমুহনী চৌরাস্তা এলাকা, গোপালপুর বাজার, কুতুবপুর, আলাইয়ারপুর, চৌমুহনী মিয়ারপুল, হাজীপুর, জিরতলী বাজার, পেশকার মার্কেট, একলাশপুর, কাজিনগর-দরবেশপুর সিএনজি স্টেশান এলাকা, আমানুল্যাপুর, মিরওয়ারিশপুর, দক্ষীন নাজিরপুর ও কেন্দুরবাগ এলাকায় কিশোরগ্যাং এর বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউপির গ্যাংলিডার দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার (২০) এক নারীকে বিবস্্রকরে নির্যাতনের ভিডিও ধারন করে প্রকাশ করার মামলায় জেলহাজতে থাকলেও বর্তমানে তার কিশোরগ্যাং বাহিনী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একলাশপুর ইউনিয়নসহ পাশ্ববর্তী রমজানবিবি বাজার এলাকায় তাদের বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছে।এছাড়াও বেগমগঞ্জের চৌমুহনী শহর ও চৌরাস্তা এলাকায় কিশোরগ্যাং এর কয়েকজন হাইব্রিড আওয়ামীলীগ নেতা তাদের বড়ভাই ও গডফাদার রয়েছে। এদের ইন্ধনে ও ছত্রছায়ায় বেগমগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিশোরগ্যাং বিভিন্ন অপরাধমুলক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। জেলা প্রশাসন সম্প্রতি শহর কেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান জোরদার করায় শহর এলাকায় তাদের তৎপরতা কিছুটা কমলেও জেলার ৯টি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিশোর গ্যাংএর মহড়া ও তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।
সম্প্রতি নোয়াখালীতে কলেজ শিক্ষার্থী জোবায়ের,স্কুল শিক্ষার্থী অদিতা ও বেগমগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সদস্য মো.হাসিবুল বাশারকে কিশোর গ্যাং এর হাতে হত্যার ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ সুপারের নির্দেশ মোতাবেক গত ১৫দিনে জেলার ৯ টি থানার পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার বিশেষ অভিযানে দুইশতাধীক কিশোর গ্যাং এর সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।সচেতন মহলের অভিযোগ,জেলার বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বেপরোয়া এসব কিশোরগ্যাং এর কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করলেও তাদের বড়ভাই অথবা গডফাদারদের গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃংখলা বাহিনী। পুলিশ জানায়,প্রয়োজন ছাড়া বাইরে ঘোরাঘুরি, আড্ডা, কিশোর গ্যাং এর সাথে জড়িত, সন্ধ্যার পর বাইরে থাকায় কিশোর বয়সী ছেলেদের আটক দেখানো হয়েছে। এদের যাচাই-বাছাই করে অধিকাংশের অভিভাবকদের জিম্মায় প্রদান করা হয়। এবং বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত সন্দেহে বাকিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে এমন অভিযানে সাধারন অভিভাবক ও সাধারণ ছাত্ররা আতঙ্কে রয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়। গত (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্ধের জেরে ৮-১০জন কিশোর গ্যাং সদস্যদের ছুরিকাঘাতে এক কলেজ ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে।এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক অভিযুক্ত রাকিব ও পলাশ নামে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। নোয়াখালী পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের চন্দ্রপুর এলাকায় শাহাজাহানের বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর এ ঘটনা ঘটে। নিহত মো. জোবায়ের (১৮) বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজগঞ্জ ইউনিয়নের আলাদিনগর গ্রামের কাজী বাড়ির কামাল উদ্দিনের ছেলে এবং নোয়াখালীর সোনাপুর আইডিয়াল পলিটেকনিক্যালের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। গত (২৫ সেপ্টেম্বর) রোববার দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় নলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে গলায় চুরি ধরে ধর্ষনের চেষ্টা করে। এসময় তার আতœচিৎকারে এলাকাবাসী এসে তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। বিনোদপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ জামালপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, নলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় তা বন্ধের জন্য বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করায় বখাটেরা এ ঘটনা ঘটায়। এর ৩দিন আগে (২২ সেপ্টেম্বর) নোয়াখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ল²ীনারায়ণপুরে দিনেদুপুরে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিয়া হোসেন অদিতাকে (১৪) ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যা করা হয়।এ ঘটনায় আবদুর রহিম রনি (২০), প্রতিবেশী ইসরাফিল (১৪), তার ভাই সাঈদ(২০)কে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে,পূর্ব শক্রতার জের ধরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত (৭ জুলাই) বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বেগমগঞ্জ উপজেলার ২নং গোপালপুর ইউনিয়নের ১নম্বর ওয়ার্ডের কোটরা মহব্বতপুর গ্রামের সুবাহান মার্কেট এলাকায় বেগমগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সদস্য মো.হাসিবুল বাশারকে (২৫) কুপিয়ে জবাই করে হত্যা করে আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশকারী হাসান,মাসুম ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গ কিশোর গ্যাংরা। নিহত হাসিবুল বাশার উপজেলার ২নং গোপালপুর ইউনিয়নের ১নম্বর ওয়ার্ডের কোটরা মহব্বতপুর গ্রামের ইউনুস মৌলভীর বাড়ির মৃত আবুল বাশারের ছেলে।স্থানীয়রা আরো জানান,এ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিগত দিনে ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও পুলিশ তা আমলে না নেয়ায় বর্তমানে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জেলার পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠা এসব বাহিনীতে রয়েছে ৫০-৬০ জনের সক্রিয় সদস্য। তারা নিজেদের ছাত্রলীগ,সেচ্ছাসেবকলীগ ও যুবলীগ নেতা বলে পরিচয় দিয়ে ব্যানার,ফেস্টুন টাঙালেও শাসক দল কখনো আপত্তি করেনি। নেতা-এমপিদের সঙ্গে ছবি দিয়ে ব্যানার থাকায় পুলিশও তাদের সমীহ করে চলত।এদিকে জেলার অভিজ্ঞ মহল মনে করে,চন্দ্রগঞ্জে পুলিশের ওপর ও এখলাশপুরে ডিবি পুলিশের ওপর কিশোরগ্যাং ও মাদক কারবারিরা হামলা করলেও পরবর্তী সময়ে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় এসব বাহিনীর দিন দিন সাহস বেড়ে গেছে।
বর্তমানে অভিযানের বিষয়ে নোয়াখালী পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম বলেন, অপরাধ প্রবনতা কমিয়ে আনতে আমাদের এ উদ্যোগ, অভিযানের পর থেকে যত্রতত্র কিশোরদের আড্ডা এবং জনমনে আতঙ্ক কমে গেছে। পাশাপাশি বাজে আড্ডায় সময় নষ্ট না হওয়ায় কিশোররা পড়ালেখায় মনোযোগী হচ্ছে।অভিভাবকগণও তাদের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে শুরু করেছে।জনস্বার্থে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি সন্তানদের প্রতি বিশেষ নজরদারি ও খোঁজ খবর রাখতে অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানান।অভিযানের পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ ও কিশোর কিশোরীদের অবৈধ সম্পর্কে না জড়াতে বিভিন্ন থানার পুলিশ কর্মকর্তাগণ, স্ক্লু, কলেজ, মসজিদ,মাদ্রাসায় গিয়ে মানুষকে সচেতন করে তুলতে কাজ করছেন।এই চলমান অভিযানে কিশোর গ্যাং এর দৌরাত্ম্য ও আড্ডা অনেকটা কমে এসেছে।সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং ধারাবাহিক ভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। নোয়াখালী জেলা পুলিশের এমন মহৎ উদ্যােগের সাথে একাত্ত¡তা প্রকাশ করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সচেতনতামৃলক সভাসমাবেশ ও সেমিনার করছে এবং এ ধরনের উদ্যোগের জন্য জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জনান।

সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে শেয়ার করুন...

এ বিভাগের আরো খবর....

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *