
জাতীয় নিশান প্রতিবেদক:
সোনাইমুড়ী উপজেলা নোয়াখালীর প্রবেশদ্বার, কুমিল্লার সীমান্তবর্তি উপজেলা হওয়ায় ২৪ এর পুরো জুলাই মাস জুড়েই ছিলো উপজেলাটি অগ্নিগর্ভ। পুলিশ আর ছাত্র-জনতা ছিলো মুখোমুখি। ফ্যাসিষ্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের গুরুত্বপূর্ন উদাহরণ হয়ে থাকবে সোনাইমুড়ী। এখানে আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে বহু ছাত্র-জনতা আহত হয় অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে। সবশেষ ৫ আগষ্ট সন্ধায় থানা পুলিশের সাথে ছাত্র জনতার সংঘের্ষ দুই পুলিশসহ ৭ জন নিহত হয়। ঘটনার দুই বছর পার হলেও তদন্তেই থেমে আছে মামলার কার্যক্রম। ন্যায় বিচার নিয়ে শঙ্কিত নিহতের পরিবারগুলো।
থানা পুলিশ, সংশ্লিষ্ঠ সূত্র ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিন ৫ আগষ্ট সন্ধার আগ মুহুর্তে সোনাইমুড়ী থানায় হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের করা হয়। এ সময় পুলিশ হামলাকারীদের ওপর গুলি ছুড়লে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। থানা এলাকায় পুলিশের গুলিতে স্থানীয় ৫ বাসিন্দা নিহত হন। একই দিনে নিহত হয়েছেন পুলিশের দুজন। পুলিশের গুলিতে নিহত ব্যক্তিরা হলেন ইয়াছিন আরাফাত (১৪), মোহাম্মদ হাসান (১৩), মাঈন উদ্দিন (৩৮), তানভির হোসেন (২৫) ও আসিফ হোসেন (২৬)। তারা সবাই সোনাইমুড়ী উপজেলার। ছাত্র-জনতার হামলায় নিহত সদস্যরা হলেন উপপরিদর্শক (এসআই) বাছির উদ্দিন ও কনস্টেবল মো. ইব্রাহিম।
এদিকে থানায় হামলা ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশসহ সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় পৃথক দুটি দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে একটির বাদী গুলিতে নিহত ছাত্রদলকর্মী আসিফ হোসেনের বাবা মো. মোরশেদ আলম। আর অন্যটির বাদী পুলিশ। দুটি মামলায় পুলিশ এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। আসিফের বাবার দায়ের করা মামলায় নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী, নোয়াখালীর সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামানও রয়েছেন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তিনজন আসামি ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
অপরদিকে ঘটনার দুই বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি থানা থেকে লুট হওয়া বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। এর মধ্যে চায়না রাইফেল, এসএমজি, পিস্তল, শটগান এবং গুলি রয়েছে।
পুলিশের গুলিতে নিহতদের একাধিক স্বজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা মামলার এমন অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট নয়। সেদিন পুলিশ প্রথমে ছাত্র-জনতার উপর গুলি করে। পরে উত্তেজিত জনতা থানায় হামলা করে। পুলিশের গুলিতে ৫টি তাজা প্রাণ ঝরে গেলেও ন্যায় বিচার নিয়ে শঙ্কিত তারা।
৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত কিশোর ইয়াছিন আরাফাতের মা পাখি বেগম জানান, আন্দোলনের সময় আমার ছেলে থানার সামনেই ছিলো। থানা থেকে একটি হঠাৎ করে এসে তার গায়ে লাগে। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ইয়াছিন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মৃত ঘোষনা করে। আমার ছেলে হত্যার বিচার কি আমরা পাবোনা। ইয়াছিন আরাফাতের মা পাখি বেগমের মতো সোনাইমুড়ীতে নিহত সবার স্বজনরাই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
ঘটনার দিন থানার ভেতরে এসআই বাছির উদ্দিনকে জবাই করে ও কনস্টেবল মো. ইব্রাহিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই দুই পুলিশ সদস্যের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার আগ্রহ নেই। কনস্টেবল মো. ইব্রাহিমের স্ত্রী রোকেয়া আক্তার জানান, ৫ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় স্বামী ইব্রাহিম তাঁকে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানিয় থানায় আক্রমন হয়েছে। এর থেকে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। পরের দিন ৬ আগষ্ট হাসপাতালে লাশ সনাক্ত করি। তিনি বর্তমানে ৪ বছর বয়সী মেয়ে রুবাইদা ইসমাতকে নিয়ে চট্টগ্রামে তাঁর বাবার বাড়িতে রয়েছেন। এবিষয়ে এসআই বাছির উদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সোনাইমুড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) কবির হোসেন জানান, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত কাজ এখনো চলমান রয়েছে। আপাতত এর বেশি কিছু বলতে পারছিনা।