
জাতীয় নিশান প্রতিবেদক:
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার রশিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিষয়ের শিক্ষক মোঃ কামরুল ইসলাম এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ে উপজেলা পর্যায়ের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এতে উপজেলার হাজার হাজার শিক্ষার্থী মেধার সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা। এ নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক কামরুল ইসলাম পড়াশোনা করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে। অথচ, গত ১০ বছর ধরে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কুমিল্লার অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর চলতি পরীক্ষায় ইংরেজি ১ম পত্রের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। খাতা মূল্যায়নের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পাবলিক পরীক্ষায় আইসিটি শিক্ষকের নাম ইংরেজি বিষয়ের প্রধান পরীক্ষকের তালিকায় থাকায় নানা আলোচনা চলছে শিক্ষক মহলে।
সূত্র জানায়, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড-এর গত ১২ জানুয়ারির অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে শিক্ষক যে বিষয়ে পাঠদান করান, কেবল সেই নির্দিষ্ট বিষয়ই অনলাইনে ইটিআইএফ প্যানেলে নির্বাচন করতে হবে। বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, ভুল বা অসত্য তথ্য প্রদান করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ, বোর্ডের ২০২৬ সালের ইংরেজি ১ম পত্রের প্রধান পরীক্ষকদের তালিকায় মোঃ কামরুল ইসলামের নাম রয়েছে। অথচ, বিদ্যালয়ের হালনাগাদ পিডিএস ডেটাবেজ বলছে, কামরুল ইসলাম মূলত আইসিটির শিক্ষক।
সূত্র আরো জানায়, কামরুল ইসলাম রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক করেছেন। আইসিটি বিষয়ের ওপরে ৬ মাসের সর্ট কোর্স করেছেন এবং তিনি স্কুলে আইসিটির শিক্ষক হিসেবেই নিয়োগপ্রাপ্ত। আইসিটির পাশাপাশি তিনি নবম শ্রেণীর ইংরেজি প্রথম পত্র পাঠদান করাতেন। ইংরেজি ক্লাস করালে প্রাইভেট কোচিং এর জন্য শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। যে কারণে গত বছর ১০ম শ্রেণীর ইংরেজি শিক্ষকের সাথে কথা বলে ইংরেজি ১ম পত্রের ক্লাস নিচ্ছেন।
সূত্র বলছে, রশিদপুর স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তালিকায় রয়েছে বিদ্যুৎ সরকারের নাম। তিনি বিগত ৫ বছর এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। এর আগে ঢাকার একটি নন এমপিও ভুক্ত স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ইংরেজি বিষয়ের ওপরে স্নাতক শেষ করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আর স্নাতকোত্তর ঢাকা কলেজ থেকে। তিনিও গত বছরে ইংরেজি ২য় পত্রের পরীক্ষক হিসেবে খাতা পেয়েছিলেন। তবে এই বছর আবেদন করেছিলেন তবে সুযোগ পাননি।
এদিকে বোর্ডের দেয়া এক নির্দেশনার ৬ নম্বারে উল্লেখ করা হয়-প্রধান পরীক্ষক বা পরীক্ষক হিসেবে ইটিআইএফ তথ্য প্রেরনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক হতে হবে। কামরুল ইসলামের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক তথ্য ফরম( ইটিআইএফ) প্যানেলে তথ্য এন্ট্রি ও চূড়ান্ত অনুমোদনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানের। রশিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আমানত হোসেনের অনুমোদন ছাড়া এই তথ্য বোর্ডে যাওয়া সম্ভব নয়।
একজন আইসিটি শিক্ষক ইংরেজি খাতা মূল্যায়ন করায় গত ১০ বছরে সোনাইমুড়ী উপজেলার হাজার হাজার শিক্ষার্থী মেধার সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সাথে সোনাইমুড়ী উপজেলার বহু যোগ্য ও অভিজ্ঞ ইংরেজি শিক্ষকরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান, বোর্ড থেকে প্রাপ্ত সম্মানী ও ক্যারিয়ারের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন। এ বিষয়ে তারা বোর্ড কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
স্কুলে সরেজমিন গিয়ে এ বিষয়ে শিক্ষক মোঃ কামরুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমি গত ১০ বছর থেকে পরীক্ষার্থীদের ইংরেজি খাতা দেখছি। এবারে প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছি। স্কুলে ৭ম থেকে ১০ম শ্রেনীর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় ইংরেজি পাঠদান করাচ্ছি। এখানে আমার কোনো কারচুপি নেই, আমি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে আবেদন করেছি এবং বোর্ড আমাকে নির্বাচন করেছে। এখানে আমার আর কিছু বলার নাই। আমি অসুস্থ ডায়াবেটিসের রোগী। বোর্ড যদি এখন মনে করে আমাকে বাদ দেবে, তাতেও আমার কোনো সমস্যা নেই।
রশিদপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আমানত হোসেন জানান, ইটিআইএফ প্যানেলে তথ্য প্রদানে কোন অনিয়ম হয়নি। মোঃ কামরুল ইসলাম আইসিটি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হলেও তিনি ইংরেজি পাঠদান করেন। গত ১০ বছর থেকে তিনি ইংরেজি খাতার পরীক্ষক। সব স্কুলেই এক বিষয়ের শিক্ষক অন্যান্য বিষয়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন। আমার এখানেও ব্যতিক্রম নয়। কোন অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে তিনি বোর্ডে তথ্য দেওয়ার কতা অস্বীকার করেন।
সোনাইমুড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মীর মোহাম্মদ মোহতাসিম বিল্লাহ জানান, বিষয়টি সম্পূর্ন কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে। কোন অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার অথরিটি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এর পরেও প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে বিষয়টি দেখবেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে কুমিল্লা মাধ্যমে ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণক প্রফেসর রুনা নাছরীনের মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ হয়নি।
তবে বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ কবীর উদ্দিন আহম্মেদ জানান, শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক তথ্য ফরম( ইটিআইএফ) প্যানেলে তথ্য এন্ট্রি দায়িত্ব সংশ্লিষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের। পরীক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হলে তার দায়ভার প্রধান শিক্ষকের। তিনি যেভাবে তথ্য দিয়েছে সেভাবেই শিক্ষকের নাম এসেছে এবং প্রধান পরীক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান করীব উদ্দিন আহম্মেদ।